রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ০১:৪৫ পূর্বাহ্ন

নরসিংদীতে ধর্ষণের ঘটনায় শালিশ,ক্ষোভে কিশোরীর আত্মহত্যার চেষ্টা

প্রতিনিধির নাম :
প্রকাশকাল : শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬
ধর্ষণের ঘটনায় সালিশে উপস্থিতির একাংশ

বাণী রিপোর্ট : নরসিংদীতে বিএনপি নেতা ও পুলিশের উপস্থিতিতে ধষর্ণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে সালিশ বসিয়ে সালিশের রায় বাস্তবায়নের চেষ্টা কালে অপমান ও ক্ষোভে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে এক কিশোরী। শুক্রবার (২২ মে) বিকেলে সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের সোনাতলা চকপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। পরে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় মুমূর্ষ অবস্থায় কিশোরীকে উদ্ধার করে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসক তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন। সালিশের ঘটনায় নরসিংদী শহরজুরে ব্যপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রত‍্যক্ষদর্শী ও সরেজমিনে এলাকায় গিয়ে জানা যায়, চিনিশপুর ইউনিয়নের সোনাতলা চকপাড়া এলাকার এক কিশোরীর পাশ্ববর্তী শিবপুর উপজেলায় বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই চকপাড়া এলাকার প্রতিবেশী প্রাইভেটকার চালক নাইম কিশোরীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে আসছিলো। কিশোরীকে ফুঁসলিয়ে স্বামীর সাথে ডিভোর্স করিয়ে নাইম তোলে নিয়ে আসে। পরে বিয়ের প্রলোভনে নাইম কিশোরীকে একাধিকবার তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারিরিক সম্পর্ক করে আসছিলো। এ ঘটনা জানাজানি হলে ভুক্তভোগী কিশোরী ও তার পরিবার নাইমকে বিয়ের জন‍্য চাপ দিতে থাকে। নাইম বিয়ে করতে অস্বীকার করলে কিশোরীর পরিবার আইনী ব্যবস্থা গ্রহন করতে চাইলে স্থানীয় বিএনপি নেতারা বিষয়টি মিমাংসা করে দিবে বলে তাদের আশ্বাস দেয়। নীরিহ কিশোরির পরিবার চাপের কারণে সালিশে রাজি হয়।

পরে শুক্রবার (২২ মে) বিকেলে সোনাতলা চকপাড়া এলাকায় জেলা বিএনপির ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ও চিনিশপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক আউলাদ হোসেন মোল্লা, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাজহারুল হক টিটু, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন খোকা, চিনিশপুর ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আমজাদ হোসেন, ইউনিয়ন যুবদল নেতা জাহাঙ্গীরসহ একাধিক নেতার উপস্থিতে সালিশ শুরু হয়। এসময় সেখানে এসআই মো. ইউনুস নামে একজন পুলিশ সদস্যও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়। সালিশ দরবারে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ বিয়ের পরিবর্তে ৫০ হাজার টাকায় মিমাংসা করার জন্য মেয়ে পক্ষকে প্রস্তাব দেয় । এ খবর কিশোরি জেনে দরবার চলাকালেই ঘরের দরজা আটকে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহতার চেষ্টা করে । এসময় পরিবারের লোকজন ঘটনা বুঝতে পেরে ঘরের দরজা ভেঙ্গে প্রবেশ করে তাকে উদ্ধার করে অজ্ঞান অবস্থায় নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। শারিরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন । সেখানে নিয়ে যাওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিওতে ভর্তি করা হয়। সেখানে কিশোরী জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে।

ভুক্তভোগী কিশোরীর মা বলেন, নাইম আমার মেয়ের সংসার ভেঙেছে। আমার মেয়েকে গত এক বছর ধরে বিয়ের প্রলোভনে ফেলে একাধিকবার ধর্ষণ করেছে। আমার মেয়ে বিয়ের কথা বললে সে তালবাহানা করতে থাকে। পরে বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হয়ে যায়। মানুষ আমার মেয়েকে নিয়ে বাজে কথা বলায় সে বাহিরে যেতো পারতো না। আজকে দরবারে তারা বিয়ের কথা না বলে প্রথমে ২০ হাজার, ৩০ হাজার ও পরে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে মিমাংসার কথা বলে। একথা শোনে মেয়ে ক্ষোভে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। এখন সে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। আমি থানায় আগেই লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলাম কিন্তু বিচার পাইনি। আমি এঘটনার দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবি করছি।

জেলা বিএনপির ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ও চিনিশপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক আউলাদ হোসেন মোল্লা বলেন, আমি অল্প সময়ের জন্য দরবারে গিয়েছিলাম, ছেলে ও মেয়ের কথা শোনে জরুরি কাজ থাকায় চলে এসেছি। পরে জানতে পেরেছি, দরবারে এগারো জনের একটি বোর্ড বসেছিলো। তারা সকলের কথা শোনে ৮ জন বিয়ের পক্ষে ও তিন জন টাকা দিয়ে সমাধানের পক্ষে মতামত দেয়। এর মধ্যে কেউ টাকা দিয়ে সমাধানের বিষয়টি জানালে মেয়েটি আত্মহত্যার চেষ্টা করে। পরে দরবার থেকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বিয়ের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। ধর্ষণ সালিশ যোগ্য কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি উভয়পক্ষের অনুরোধে গিয়েছিলাম। যেখানে এলাকার অনেক মানুষ ছিলো

নরসিংদী সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. খায়রুল ইসলাম বলেন, সন্ধ্যায় ফাঁস নেওয়া এক কিশোরীকে অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়।

চিনিশপুর ইউনিয়নের বিট অফিসার মো. ইসহাক মিয়া বলেন, সোনাতলা চকপাড়া এলাকায় সালিশে আমি ছিলাম না তবে মো. ইউনুস নামে একজন পুলিশ সদস্য ছিলো। কিন্তু সালিশে নিজের উপস্থিতির বিষয়টি অস্বীকার করেছে এসআই মো. ইউনূস। তিনি জানান, আমি ঘটনার খোঁজ খবর নিয়েছি। কিন্তু সালিশে ছিলাম না।

নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম আর আল মামুন বলেন, সালিসে আমাদের কোন পুলিশ সদস্য ছিলো না। আমরা শারীরিক সর্ম্পকের ঘটনায় একটা মৌখিক অভিযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু কোন লিখিত অভিযোগ পায়নি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা